পদত্যাগে বাধ্য হলেন মোবারক

বশেষে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক। জয় হয়েছে মিসরে জনতার। টানা ১৮ দিনের নাটকীয় পরিস্থিতির যবনিকা টেনে গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলাইমান মোবারকের ইস্তফা দেওয়ার কথা জানান।

ওমর বলেন, জাতীয় বিষয়াদি দেখভালের জন্য ঊর্ধ্বতন সামরিক পর্ষদের কাছে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করে গেছেন। পদত্যাগের ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কয়ারে বিক্ষোভকারীরা উল্লাসে ফেটে পড়ে। খবর বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্সের।
এর আগে প্রবল গণবিক্ষোভের মুখে গতকাল সকালে কায়রোর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ছেড়ে যান প্রেসিডেন্ট মোবারক। সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, প্রেসিডেন্ট মোবারক তাঁর পরিবার নিয়ে কায়রো ছেড়েছেন। পরে ক্ষমতাসীন দলের এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেন, মিসরের অবকাশযাপন কেন্দ্র শারম আল-শেখে গেছেন মোবারক।
শারম আল-শেখে মোবারকের যাওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গতকাল তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, মিসরের সামরিক বাহিনীকে অবশ্যই আস্থার সঙ্গে গণতন্ত্রে উত্তরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
মোবারকের পদত্যাগের ঘোষণায় কায়রোর তাহরির স্কয়ারে বিক্ষোভরত লাখো জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে। বাঁধভাঙা খুশিতে তাদের নেচে-গেয়ে আনন্দ-উল্লাস করতে দেখা যায়। তারা পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করতে থাকে। আবেগে অনেককে এ সময় চোখের পানি মুছতে দেখা যায়। টানা ১৮ দিন তাহরির স্কয়ারে অবস্থান করার কারণে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মোবারকের ৩০ বছরের শাসনের অবসানের খবরে এক মুহূর্তে তাদের সে ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। বিক্ষোভের আয়োজকদের অন্যতম নেতা মোহাম্মাদ ইব্রাহিম চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘তাঁকে গদিছাড়া করতে আমরা ১৮ দিন এখানে অনড় হয়ে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমরা সফল হয়েছি। এবার আমরা বাড়ি ফিরব।’
আহমেদ জাহরান নামের এক তরুণ বলেন, ‘এত শিগগির মোবারককে উৎখাত করতে পারব, ভাবতে পারিনি।’ শুধু তাহরির স্কয়ার নয়, রাজধানীর বাইরের সব গুরুত্বপূর্ণ শহরে মিসরবাসীকে উল্লাস করতে দেখা যায়।
হোসনি মোবারকের পদত্যাগের পর আন্দোলনকারীদের অন্যতম নেতা এলবারাদি বলেন, ‘আমরা আবার আমাদের জীবন ফিরে পেয়েছি।’ মিসরবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছো। এর সদ্ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহ তোমাদের সহায় হোন।’
মিসরের প্রধান বিরোধী দল মুসলিম ব্রাদারহুড বলেছে, তারা মোবারকের বিদায়ে উচ্ছ্বসিত। দলের মুখপাত্র এসাম এল এরিয়ান এএফপিকে বলেন, ‘আমরা সেনাবাহিনীকে সালাম জানাই। তারা তাদের কথা রেখেছে।’
এদিকে, সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মোবারকের পদত্যাগের পরপরই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সে দেশে মোবারকের থাকা সব ধরনের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, সে দেশে হোসনি মোবারকের কোটি কোটি ডলারের সম্পদ রয়েছে।
এদিকে, এ ঘটনায় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, মিসরকে অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি এটিকে একটি ‘স্মরণীয় দিন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তবে এ বিষয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতারা সাবধানী মন্তব্য করেছেন। তাঁরা বলেছেন, মিসরে গণতন্ত্রের পথে উঠে আসতে হবে। একই সঙ্গে তাঁরা হোসনি মোবারকের পদত্যাগে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি-প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সিনেটের ফরেন রিলেশনস কমিটির চেয়ারম্যান জন কেরি বলেন, ‘এটা মিসরের জন্য এক অভাবনীয় মুহূর্ত। তবে গণতন্ত্রের পথে উঠে আসতে তাদের আরও অনেক পরিশ্রম করতে হবে।’
রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন বলেন, ওয়াশিংটন মিসরের পাশে আছে। গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের জন্য তারা মিসরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে।
বৃহস্পতিবার রাতে মোবারক জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তাঁর ক্ষমতা না ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর গতকাল সকাল থেকেই মোবারকের তাৎক্ষণিক পদত্যাগের দাবিতে কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, সুয়েজসহ মিসরের বিভিন্ন শহর ছিল উত্তাল। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, কায়রোর রাজপথে গতকাল ১০ লাখ লোকের ঢল নেমেছিল।
কায়রোয় তাহরির স্কয়ারে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেয়, ‘মোবারক তুমি এখনই যাও।’ বিক্ষোভকারীরা সাধারণ নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানায়, তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ‘লাখো মানুষের বিক্ষোভে সমাবেশ’ সফল করতে। দিনটিকে তারা আবারও মোবারকের ‘বিদায়ী শুক্রবার’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর আগের শুক্রবারও তারা একই কর্মসূচি পালন করেছিল।
গতকাল বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা তাহরির স্কয়ারে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেন। বিক্ষোভকারী তাহরির স্কয়ারে সরকারবিরোধী স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে বলে, সেনাবাহিনী ও জনতা ঐক্যবদ্ধ। দুপুরের দিকে তারা কায়রোয় প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে। প্রাসাদের সামনে তারা জুমার নামাজ আদায় করে। প্রাসাদ অবরোধ করে তারা স্লোগান দেয়, ‘সরে দাঁড়াও, সরে দাঁড়াও মোবারক।’ কেন তুমি পদ আঁকড়ে আছো? ৩০ বছর যথেষ্ট।’ বিক্ষোভকারীদের আরেকটি অংশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যালয়ের সামনে অবরোধ করে। দুই হাজারের বেশি মানুষ সেখানে বিক্ষোভে যোগ দেয়। বেতার কার্যালয়ের সামনেও অবরোধ করা হয়। কায়রোর বিভিন্ন সরকারি ভবনের সামনেও বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল।
এর আগে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, সুস্থিতি ফিরে এলে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হবে। তবে এ ব্যাপারে কোনো দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়নি।
হোসনি মোবারককে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করার জন্য গত ২৫ জানুয়ারি থেকে মিসরে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। কায়রোর তাহরির স্কয়ারকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সরকারবিরোধী এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভের শুরুর দিকে আন্দোলনকারী ও পুলিশের সংঘর্ষে শতাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারায়। টানা ১৮ দিন ধরে তাহরির স্কয়ারে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন মোবারকের পদত্যাগকে স্বাগত জানিয়ে জোর দিয়ে বলেন, এখন মিসরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অবশ্যই দেশটির জনগণই ঠিক করবে। তিনি একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানান।
মোবারক হলেন আরব বিশ্বে দ্বিতীয় নেতা, যিনি এক মাসের মধ্যে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেন। অবসান হলো মোবারকের ৩০ বছরের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের। এর আগে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলী গণবিক্ষোভের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
এদিকে হোসনি মোবারকের পদত্যাগের খবরে গতকাল ওয়াল স্ট্রিট শেয়ারবাজার চাঙা হয়ে ওঠে।
Share this post :

Post a Comment

Test Sidebar

 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. BdNewsTest - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger